মানুষের সভ্যতার ইতিহাস মূলত সম্পর্কের ইতিহাস। আগুন আবিষ্কার, চাকা নির্মাণ, নগর গড়ে তোলা কিংবা প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি এসবের মধ্যেও মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবিকতা। একটি শিশু যখন পৃথিবীর আলো দেখে, তখন তার প্রথম আশ্রয় হয় মায়ের বুক। সেই বুকের উষ্ণতা, সেই নির্ঘুম রাত, সেই নিঃস্বার্থ ত্যাগের ওপর ভর করেই গড়ে ওঠে একজন মানুষের জীবন, ব্যক্তিত্ব এবং ভবিষ্যৎ। অথচ সময়ের নির্মম পরিহাসে অনেক মা-বাবাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হয়ে পড়েন অবহেলিত, নিঃসঙ্গ এবং অদৃশ্য। চারপাশে মানুষ থাকে, কিন্তু পাশে কেউ থাকে না; ঘর থাকে, কিন্তু আপনজনের স্পর্শ থাকে না; জীবন থাকে, কিন্তু জীবনের আনন্দ থাকে না। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকার একটি বহুতল ভবনের একটি ফ্ল্যাট। দরজার ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা। দিন কেটে গেছে, রাত কেটে গেছে, কিন্তু কেউ খোঁজ নেয়নি। অবশেষে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। পুলিশ এসে দরজা খুলে দেখতে পায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য একজন বৃদ্ধা মায়ের পচাগলা মরদেহ পড়ে আছে। মৃত্যুর পর কেটে গেছে কয়েকটি দিন। জীবনের শেষ মুহূর্তে পাশে ছিল না কোনো সন্তান, কোনো স্বজন, কোনো পরিচিত মুখ। এই মৃত্যু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির গণ্ডি অতিক্রম করে আমাদের সময়ের নৈতিক সংকট, পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং মানবিকতার ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ার এক নির্মম দলিল হয়ে উঠেছে। একজন মায়ের পচাগলা মরদেহের চেয়েও ভয়ংকর ছিল তাঁর দীর্ঘ অপেক্ষা সন্তানের জন্য, একটি ফোনকলের জন্য, একটি খোঁজ নেওয়ার জন্য, হয়তো একটি মাত্র বাক্যের জন্য “মা, তুমি কেমন আছো?” সেই অপূর্ণ অপেক্ষার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের সভ্যতার সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন।
নূরজাহান বেগম থেকে আমাদের সবার মায়ের গল্প :
নূরজাহান বেগম নামটি আজ একটি প্রতীক। তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি বাংলাদেশের অসংখ্য মায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন। সেই সব মায়েদের, যারা নিজের জীবনকে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গ করেছেন। যাঁরা নিজের সুখ, স্বপ্ন, ইচ্ছা, আরাম সবকিছু বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের মানুষ করেছেন। কিন্তু বার্ধক্যের প্রান্তে এসে তাঁদের অনেকেই নিঃসঙ্গতা, অবহেলা এবং মানসিক শূন্যতার শিকার হন।
শিক্ষিত সমাজের সামনে একটি নিষ্ঠুর প্রশ্ন :
ঘটনাটিকে আরও বেদনাদায়ক করেছে একটি বিষয়। নূরজাহান বেগমের সন্তানরা সমাজের প্রতিষ্ঠিত মানুষ। একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা (যুগ্ন সচিব), একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক, আরেকজন শিক্ষকতা জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রশ্ন হচ্ছে শিক্ষা কি কেবল পেশাগত সাফল্যের জন্য, নাকি মানুষ হওয়ার জন্যও? যদি শিক্ষা মানবিকতা সৃষ্টি না করে, তবে সেই শিক্ষার পূর্ণতা কোথায়?
নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে শেষ যাত্রা :
মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু মৃত্যুর মুহূর্তে সম্পূর্ণ একা হয়ে যাওয়া মানবজীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। একজন মা, যিনি একসময় সন্তানদের পৃথিবীর কেন্দ্র ছিলেন, তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় যদি নিঃসঙ্গতা দিয়ে শেষ হয়, তবে সেটি কেবল পারিবারিক নয়, সামাজিক ব্যর্থতাও।
প্রতিষ্ঠিত সন্তানেরা, অনিরাপদ বার্ধক্য : সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নূরজাহান বেগমের সন্তানদের মধ্যে একজন যুগ্ম সচিব, একজন বুয়েটের শিক্ষক এবং একজন শিক্ষিকা। অর্থাৎ পরিবারটি শিক্ষা ও পেশাগত সাফল্যের দিক থেকে সমাজের উচ্চস্তরে অবস্থান করছিল। কিন্তু এই ঘটনাই দেখিয়ে দিয়েছে—সাফল্য ও মানবিকতা সবসময় সমার্থক নয়।
পরিবার নামের প্রতিষ্ঠানটি কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে? একসময় যৌথ পরিবার ছিল আমাদের সামাজিক শক্তি। দাদা-দাদি, নানা-নানি, মা-বাবা ও সন্তানরা একই ছাদের নিচে বসবাস করতেন। আধুনিক নগরায়ণ সেই কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা নতুন কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোও গড়ে তুলতে পারিনি।
নীরব মহামারি :
প্রবীণদের একাকীত্ব : বিশ্বের বহু দেশে প্রবীণদের একাকীত্বকে এখন ‘Silent Epidemic’ বা নীরব মহামারি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। একাকীত্ব শুধু মানসিক কষ্টই বাড়ায় না; এটি হৃদরোগ, বিষণ্নতা, স্মৃতিভ্রংশ এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকিও বৃদ্ধি করে।
আমাদের সন্তানদের আমরা কী শেখাচ্ছি? আজকের শিশুরা প্রতিযোগিতা শিখছে, প্রযুক্তি শিখছে, ক্যারিয়ার গড়া শিখছে। কিন্তু তারা কি সহানুভূতি শিখছে? তারা কি শিখছে বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে? সমাজ হিসেবে আমাদের এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে।
ডিগ্রি মানুষ বানায় না :
আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি ভুল ধারণা লালন করেছি উচ্চশিক্ষিত মানেই ভালো মানুষ। বাস্তবতা বারবার প্রমাণ করেছে, ডিগ্রি জ্ঞান দিতে পারে, দক্ষতা দিতে পারে, পেশাগত সাফল্য দিতে পারে; কিন্তু মানবিকতা শেখানোর দায়িত্ব পরিবার, সমাজ এবং ব্যক্তিগত মূল্যবোধের। একজন মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী হতে পারেন, কিন্তু যদি তাঁর হৃদয়ে মমতা না থাকে, তবে সেই অর্জনের নৈতিক মূল্য সীমিত হয়ে যায়।
মায়ের ত্যাগের কোনো হিসাব হয় না :
একজন মা সন্তানের জন্য কী করেন, তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। তিনি রাত জাগেন, কাঁদেন, প্রার্থনা করেন, নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দেন। সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজের বর্তমানকে উৎসর্গ করেন। একটি সন্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে যে পরিমাণ ত্যাগ লুকিয়ে থাকে, তার পূর্ণ মূল্য কখনোই পরিশোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু অন্তত সম্মান, যত্ন এবং ভালোবাসা তো দেওয়া সম্ভব।
ভালোবাসার অভাবই সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য :
সমাজে আমরা অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের কথা বলি। কিন্তু ভালোবাসার দারিদ্র্য আরও ভয়ংকর। একজন বৃদ্ধ মানুষের কাছে হয়তো খাবার আছে, ওষুধ আছে, মাথা গোঁজার ঠাঁই আছে; কিন্তু যদি কথা বলার মানুষ না থাকে, তবে তাঁর জীবন গভীর শূন্যতায় ডুবে যায়। একাকীত্ব মানুষের আত্মাকে ক্ষয় করে দেয়।
আমার নিজের পরিবারের শিক্ষা :
নূরজাহান বেগমের ঘটনা আমাকে আমার নিজের পরিবারের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমি একজন নারী, একজন কন্যা। আমার মা-বাবা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আমার অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ভাই হাজার মাইল দূরে থাকলেও প্রতিদিন মা-বাবার খোঁজ নেন। ঢাকায় থাকা আমার ছোট বোনও সর্বদা তাঁদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আর আমি বরিশালে থেকেও সবসময় তাঁদের সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়ার চেষ্টা করি। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, পৃথিবীর সব অর্জনের চেয়েও বাবা-মায়ের দোয়া বড়।
দূরত্ব কখনও ভালোবাসার মাপকাঠি নয় :
অনেকে মনে করেন, বিদেশে থাকলে বাবা-মায়ের পাশে থাকা সম্ভব নয়। বাস্তবে এটি পুরো সত্য নয়। প্রযুক্তির এই যুগে প্রতিদিন যোগাযোগ করা যায়, খোঁজ নেওয়া যায়, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা যায়। প্রকৃত দূরত্ব কিলোমিটারে নয়; প্রকৃত দূরত্ব হৃদয়ের।
শাশুড়িও একজন মা :
আমার জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো মাতৃত্বের কোনো বিভাজন নেই। আমি আমার শাশুড়ি মাকেও নিজের মায়ের মতোই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসি। কারণ একজন মা কেবল জন্ম দেন না; তিনি ভালোবাসা, স্নেহ এবং আশ্রয়ের প্রতীক। একজন নারীর জীবনে দুই পরিবারকে একসূত্রে বাঁধার অন্যতম শক্তি হলো এই পারস্পরিক সম্মান।
পরিবারের শক্তি ভালোবাসায় :
আমার স্বামী তাঁর মা-বাবাকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। আমার পাঁচজন ননদও তাঁদের মায়ের প্রতি অসাধারণ দায়িত্বশীল। তাঁদের সম্পর্ক দেখে আমি বারবার উপলব্ধি করি, ভালোবাসা এখনও পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়নি। এখনও অসংখ্য পরিবার আছে, যেখানে মা-বাবার মুখের হাসিই সন্তানদের সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
একাকীত্ব এখন বৈশ্বিক সংকট :
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বর্তমানে প্রবীণদের একাকীত্বকে একটি বড় সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি একাকীত্ব বিষণ্নতা, হৃদরোগ, স্মৃতিভ্রংশ এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে প্রবীণদের একাকীত্ব মোকাবিলায় বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তিত পরিবারব্যবস্থা :
বাংলাদেশে একসময় যৌথ পরিবার ছিল সামাজিক নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি। এখন অণু পরিবার, নগরায়ণ এবং কর্মজীবনের ব্যস্ততা সেই কাঠামোকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো আমরা এখনও গড়ে তুলতে পারিনি। ফলে অনেক প্রবীণ মানুষ নিঃসঙ্গতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
অর্থ দায়িত্বের বিকল্প নয় :
অনেক সন্তান মনে করেন, নিয়মিত টাকা পাঠালেই দায়িত্ব শেষ। অর্থ দিয়ে ওষুধ কেনা যায়, মমতা কেনা যায় না। কিন্তু একজন মা-বাবার প্রয়োজন কেবল অর্থ নয়। তাঁরা চান সঙ্গ, সম্মান, সময় এবং আন্তরিকতা। বৃদ্ধ বয়সে মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায় একাকীত্বকে। সেই ভয় দূর করার দায়িত্ব সন্তানের।
মূল্যবোধের সংকট :
আজকের সমাজে সাফল্যের সংজ্ঞা ক্রমশ আর্থিক ও পেশাগত অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মূল্যবোধ, কৃতজ্ঞতা, সহমর্মিতা এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধের চর্চা কমে যাচ্ছে। আমরা সন্তানদের প্রতিযোগিতা শেখাচ্ছি, কিন্তু মানবিকতা শেখাতে ব্যর্থ হচ্ছি।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয় :
বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অথচ প্রবীণবান্ধব সামাজিক সেবা, মানসিক সহায়তা, হোম কেয়ার ব্যবস্থা এবং কমিউনিটি পর্যায়ের নজরদারি এখনও অপর্যাপ্ত। একা বসবাসকারী প্রবীণদের জন্য স্থানীয় সরকারভিত্তিক বিশেষ সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন : কী বলে বর্তমান আইন?
বাংলাদেশে ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন প্রণয়ন করা হয়। আইনে বলা হয়েছে, সন্তানদের পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে, নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করতে হবে। আইন লঙ্ঘনের জন্য অর্থদণ্ড এবং কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইনের বাস্তবায়নের নতুন ধাপ
২০২৩ সালে এই আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়, যাতে অভিযোগ, তদন্ত ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে আরও সুসংগঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ এখনো সীমিত। এখন আইন আছে, ভয় কোথায়? অনেক আইন কাগজে-কলমে থাকে, কিন্তু বাস্তবে তার প্রভাব দেখা যায় না। কারণ আইনের কার্যকর প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা এবং জবাবদিহি একসঙ্গে না থাকলে আইন একা সমাজ পরিবর্তন করতে পারে না।
শাস্তি কি আরও কঠোর হওয়া উচিত? অনেকেই মত দিচ্ছেন যে প্রবীণ মা-বাবাকে ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ, অবহেলা বা জীবনঝুঁকিতে ফেলার মতো ঘটনায় বর্তমান শাস্তির বিধান পুনর্বিবেচনা করা উচিত। তবে শাস্তির মাত্রা কত হবে, তা আইন কমিশন, সংসদ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোচনার বিষয়। জনমতের আলোকে বিষয়টি পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা :
ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে একাকী বসবাসকারী প্রবীণদের একটি জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করা যেতে পারে। নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
প্রতিবেশীরাও দায়িত্বহীন নন :
আমাদের সমাজে একসময় প্রতিবেশীরা ছিল সম্প্রসারিত পরিবারের মতো। আজ সেই সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে গেছে। কিন্তু মানবিক সমাজ গড়তে হলে প্রতিবেশীসুলভ দায়বদ্ধতাও পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।
পিতা-মাতার ভরণপোষণ, ইসলামের কঠোর নির্দেশনা :
ইসলামে পিতা-মাতার ভরণপোষণ, সেবাযত্ন ও সম্মান কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি সন্তানের ওপর ফরজ দায়িত্বের পর্যায়ে বিবেচিত। পবিত্র আল কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর ইবাদতের নির্দেশের পরপরই পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের আদেশ দিয়েছেন এবং তাঁদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে ‘উফ’ শব্দটুকু বলতেও নিষেধ করেছেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) পিতা-মাতার অবাধ্যতাকে কবিরা গুনাহ বা মহাপাপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যে সন্তান বৃদ্ধ মা-বাবার খোঁজ নেয় না, তাঁদের কষ্ট দেয়, অবহেলা করে বা একাকীত্বে ফেলে রাখে, সে শুধু মানবিক দায়িত্বেই ব্যর্থ হয় না; ইসলামের দৃষ্টিতেও গুরুতর জবাবদিহির মুখোমুখি হয়। যে মা নিজের জীবন, যৌবন ও সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে বড় করেছেন, তাঁর বার্ধক্যে অবহেলা কোনো মুসলমানের জন্য গৌরবের নয়, বরং লজ্জা, পাপ এবং নৈতিক অধঃপতনের পরিচয়। ইসলাম স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয় পিতা-মাতার সন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁদের অসন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত।
সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ :
নূরজাহান বেগমের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় দেশব্যাপী আলোচনা হওয়ার সাথে সাথেই প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের দৃষ্টিগোচর হলে তিনি তার সরকারের সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বললে তাঁর ছেলে যুগ্ম সচিব ড. এ কে এম আনিসুর রহমানকে ওএসডি করেছে এবং ঘটনাটি তদন্তের আওতায় এনেছে। একই সঙ্গে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনার কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে কোনো সন্তান তাঁর দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন, তাহলে আইনের প্রয়োগ যেন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে নিশ্চিত হয়। কারণ একজন মায়ের নিঃসঙ্গ মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের বেদনা নয়; এটি দায়িত্ব, জবাবদিহি ও মানবিকতারও কঠিন পরীক্ষা।
সরকারের কাছে প্রত্যাশা :
জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশ নায়ক তারেক রহমানের সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হোক। প্রবীণদের জন্য বিশেষ হেল্পলাইন, জরুরি সেবা, কমিউনিটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং আইনি সহায়তা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বার্ধক্যের জন্য প্রস্তুতি :
বর্তমান প্রজন্মের মা-বাবাদের জন্যও এই ঘটনা একটি শিক্ষা। সন্তানের প্রতি ভালোবাসা থাকবে, কিন্তু একইসঙ্গে বার্ধক্যের আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার পরিকল্পনাও জরুরি।
হাজারো নূরজাহানের আর্তনাদ :
আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাজারো প্রবীণ মানুষ নীরবে অপেক্ষা করছেন। কেউ একটি ফোন কলের জন্য, কেউ একটি সাক্ষাতের জন্য, কেউ শুধু একটি প্রশ্নের জন্য “মা, কেমন আছো?” এই অপেক্ষার মূল্য আমরা কতটা বুঝি?
মানবিকতা শুরু হয় ঘর থেকে :
আমরা প্রায়ই মানবিক সমাজ গঠনের কথা বলি। কিন্তু মানবিকতার প্রথম পাঠ শুরু হয় নিজের ঘরে। বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে বসা, তাঁদের কথা শোনা, তাঁদের অনুভূতির মূল্য দেওয়া এসবই প্রকৃত মানবিকতার ভিত্তি।
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের কাছ থেকেই শিখছে :
আমরা আমাদের সন্তানদের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করি, তারা তা মনে রাখে। আবার আমরা আমাদের মা-বাবার সঙ্গে যেভাবে আচরণ করি, তারাও সেটি দেখে শেখে। আজ আমরা যদি বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বহীন হই, আগামী প্রজন্মও সেই সংস্কৃতিই উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ করবে।
একটি ফোনকলের মূল্য :
অনেক সময় বড় কোনো ত্যাগের প্রয়োজন হয় না। একটি ফোনকল, কয়েক মিনিট কথা বলা, নিয়মিত খোঁজ নেওয়া, হঠাৎ গিয়ে দেখা করা এসব ছোট কাজই একজন প্রবীণ মানুষের জীবনে বিশাল আনন্দ এনে দিতে পারে। ভালোবাসার প্রকাশ সবসময় বড় আয়োজনের মাধ্যমে হয় না; হয় আন্তরিক উপস্থিতির মাধ্যমে।
পরিশেষে, নূরজাহান বেগম আর ফিরে আসবেন না। তাঁর অপেক্ষা শেষ হয়েছে। কিন্তু তাঁর নিঃসঙ্গ মৃত্যু আমাদের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা রেখে গেছে। আমরা কেমন সমাজ গড়ে তুলছি? এমন সমাজ, যেখানে মানুষের চেয়ে অর্জনের মূল্য বেশি? যেখানে সম্পর্কের চেয়ে ব্যস্ততা বড়? নাকি এমন সমাজ, যেখানে মা-বাবার মুখের হাসি এখনও সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ? আজও সময় আছে। ফোনটা হাতে নেওয়া যায়। মায়ের খোঁজ নেওয়া যায়। বাবার পাশে বসা যায়। সম্পর্কের দরজাগুলো আবার খুলে দেওয়া যায়। কারণ যে সমাজ তার মা-বাবাকে সম্মান করতে পারে না, সে সমাজ কখনোই সত্যিকারের সভ্য হতে পারে না। নূরজাহান বেগমের নিঃসঙ্গ মৃত্যু যেন আর কোনো মায়ের নিয়তি না হয় এই হোক আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক অঙ্গীকার।
লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির / অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
https://slotbet.online/