বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি। সম্ভাবনা নিয়ে বলি, সৌন্দর্য নিয়ে বলি, বৈচিত্র?্য নিয়ে বলি। সভা করি, সেমিনার করি, ফিতা কাটি, ছবি তুলি, রিপোর্ট ছাপাই। কথারা বড় হয়। আমরা বড় হই। বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প বড় হয় না! কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশ বাদে একই অঞ্চলের কয়েকটি দেশ সম্ভাবনাকে আর গালগল্পে রাখেনি। তারা সেটাকে নগদে তুলেছে। শৈল্পিক মাথায় পর্যটনকে শিল্প বানিয়েছে। আর শিল্পকে বানিয়েছে অর্থনীতি।
কথা নয়, এবার সংখ্যার ভাষায় দেখা যাক। কারা সম্ভাবনাকে বাস্তবতায় বদলেছে, আর কারা এখনও গল্পেই আটকে আছে। থাইল্যান্ড বুঝেছে, পর্যটন মানে শুধু ভ্রমণ নয়! এটি অর্থনীতি, ক্যাশফ্লো। তারা সৌন্দর্যকে পণ্য বানিয়েছে, অভিজ্ঞতাকে বাজারে তুলেছে, আর পর্যটককে করেছে ক্রেতা। থাইল্যান্ডের আয়তন প্রায় ৫ লাখ ১৩ হাজার বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা প্রায় ৭ কোটির কাছাকাছি। ২০২৩-২৪ সময়কালে থাইল্যান্ডে বছরে প্রায় ২৮-৩০ মিলিয়ন আন্তর্জাতিক পর্যটক পর্যটন করে। থাইল্যান্ডের সৌন্দর্য তরজমা করে, থাইল্যান্ডি জীবন দেখে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে। পর্যটন খাত থেকে তাদের আয় প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, যা বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক ৫ লাখ কোটি টাকার আশপাশে। অর্থাৎ ৭ কোটি মানুষের একটি দেশ, ৫ লাখ বর্গকিলোমিটার জায়গা, শুধু পর্যটন থেকেই যে আয় করে, তা বাংলাদেশের বার্ষিক জাতীয় বাজেটের প্রায় ৬০ শতাংশের সমান।
মালয়েশিয়া এক কাঠি সরেস, বুঝেছে branding মানেই বিনিয়োগ। ‘Malaysia, Truly Asia’ শুধু স্লোগান নয়, ব্যবসা। পরিকল্পিত ব্র?্যান্ড। ডিজিটাল, কনটেন্ট, প্রচারণা একসঙ্গে চালায়। কথা কম। বিক্রি বেশি। মালয়েশিয়ার আয়তন প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ। বছরে ২০ মিলিয়নের বেশি পর্যটক আসে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হয়েও পর্যটনে কোনো সংকোচ নেই, খোলা মনে ‘স্বাগতম’ বিক্রি করে, চড়া দামে। আয় ২৫-৩০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের বাজেটের প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশের সমান। মালদ্বীপ ছোট্ট একটি দ্বীপরাষ্ট্র। আয়তন প্রায় ৩০০ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা মাত্র ৫-৬ লাখ। তবুও বছরে ১৫-২০ লাখ পর্যটক যায়। আয় ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের বাজেটের প্রায় ৫-৭ শতাংশের সমান। সম্পদ সীমিত। চিন্তা অসীম। পর্যটনকে premium experience বানিয়েছে। ক্লাস পর্যটক আনে। খরচ বেশি রাখে। সব পর্যটক না, ঠিক পর্যটক আনে। এক কথায়, রানির খাসকামরা, গরিবদের প্রবেশ নিষেধ!
শ্রীলংকার আয়তন প্রায় ৬৫ হাজার বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ। সংকটের মধ্যেও বছরে ১০-২০ লাখ পর্যটক ধরে রাখে। আয় ৩-৪ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের হিসেবে ৩০-৪০ হাজার কোটি টাকা। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মাতলামির মধ্যেও পর্যটনকে পুনর্গঠন করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ। সম্ভাবনায় এগিয়ে। বাস্তবতায় পিছিয়ে। সম্ভাবনার রানি। বাস্তবতার প্রজা। এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি! প্রায় ১৮ কোটির মানুষ আর ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটারের একটি দেশ, বাংলাদেশ; যেখানে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা এখনও বছরে কয়েক লাখের মধ্যে ঘোরাফেরা করে, আর আয় জাতীয় বাজেটের ১-২ শতাংশেরও কম! অর্থাৎ তারা ছোট হয়ে বড় আয় করে, আর আমরা বড় হয়েও ছোট আয় করি। আমরা এখনও পর্যটনকে ‘event’ হিসেবে দেখি, ‘economy’ হিসেবে নয়। তারা পর্যটন দিয়ে বাজেট তোলে। আমাদের সম্ভাবনার গালগল্প!
একই অঞ্চলে দাঁড়িয়ে, তারা গন্তব্য, আমরা এখনও মানচিত্রে নিজের অবস্থান খুঁজছি। তারা যেখানে ‘tourist journey’ ডিজাইন করে, আমরা এখনও ‘spot’ উন্নয়ন নিয়ে ব্যস্ত। ফলে পর্যটক আসে, দেখে, কিন্তু অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেরে না। সবচেয়ে বড় পার্থক্য, তাদের কাছে পর্যটন একটি policy priority, আর আমাদের কাছে এটি প্রায়ই একটি ceremonial activity। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ বা শ্রীলংকা প্রকৃতির দিক থেকে বাংলাদেশের চেয়ে খুব বেশি এগিয়ে নয়। কিন্তু ব্যবস্থাপনায় এগিয়ে। চিন্তায় এগিয়ে। পার্থক্যটা ভূপ্রকৃতিতে নয়। পার্থক্যটা ভঙ্গিতে। দৃষ্টিভঙ্গিতে। তারা পর্যটনকে ‘industry’ হিসেবে দেখেছে। রুটি-রুজির জায়গা হিসেবে দেখেছে। মেধাহীন পরিকল্পনা আর বেলুন-ফিতেয় মোড়ানো ‘event’ হিসেবে নয়। তারা শুধু ম্যারাথন মিটিং, ফাইলের স্তূপ বা অনুষ্ঠান করে না। ডেটা দেখে। বাজার বোঝে। টার্গেট ঠিক করে। পাক্কা বাজারজাত কোম্পানি। মাল বানায়। ভ্যালু এড করে। ভ্যালুয়েবল করে। তারপর মাল বেচে। আমাদের ক্ষেত্রে উল্টো। ফাঁকিবাজ মার্কেটিং অফিসারের স্টাইল। মগজ কম। সিদ্ধান্ত কম। ঘোষণা বেশি। ফাঁপর বেশি। তারা পর্যটকের চাহিদা ও অভিজ্ঞতাকে চালান করে পুরো ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে। airport থেকে hotel। street food থেকে daylife, তারপর nightlife। জীবনযাপন, জীবন উদ্্যাপনের প্রক্রিয়া। সবকিছু একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। সেখানে পর্যটন মানে শুধু দর্শন নয়। একটি curated experience। আমি এই experience দেখতে এবং দেখাতে ৩৬ বার শুধু থাইল্যান্ডে গিয়েছি। নিজের চোখে দেখেছি পাতায়ার pedestrian road। কোফাংগানের full moon party। লিলা বিচের সৌন্দর্য দেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছি। ক্যামেরার চোখে ধরে এনেছি। ইউটিউবে বাজারজাত করেছি, করছি। আমাদের এয়ারপোর্ট এখনও বাংলাদেশের আয়না হয়ে ওঠেনি, যেখানে নেমেই বাংলাদেশ নামের নান্দনিক সিনেমার ট্রেইলার দেখা যাবে। বরং অনেক সময় সেই ট্রেইলারই হয়ে যায় ফ্লপ সিনেমার প্রথম দৃশ্য। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, সেবা অসামঞ্জস্যপূর্ণ, পরিকল্পনা অপরিকল্পিত। সিদ্ধান্ত কম, ঘোষণা বেশি। ফ্লপ নায়িকাদের মতো, ঘোষণা আছে, কাজ নেই, ফাঁপরবাজি। এখানেই আমরা পিছিয়ে পড়ি। তারা পরিকল্পনা করে বাজারের জন্য, আমরা পরিকল্পনা করি ফাইলের জন্য। তারা অভিজ্ঞতা বিক্রি করে, আমরা এখনও দৃশ্য দেখাই। তারা ব্র্যান্ড তৈরি করে, আমরা স্লোগান বানাই। সেই স্লোগান নিয়েই বছরভর সেমিনার করি। ফিতা কাটি। বেলুন ওড়াই। গ্রুপ ছবি তুলি। তারপর কর্তাকে আলাদা করে চিপায় নিয়ে সেলফি। এভাবেই ‘খুশিকরণ প্রকল্প’ চলে…।
আমাদের আছে সমুদ্র, পাহাড়, অরণ্য, সংস্কৃতি, কিন্তু নেই সমন্বিত পরিকল্পনা। আমাদের আছে লোকেশন, কিন্তু নেই positioning। আমাদের আছে গল্প, কিন্তু নেই storytelling। পর্যটন এখন আর ‘place’ না, এটি ‘perception’। যে দেশ perception তৈরি করতে পারে, সেই দেশ পর্যটন আয় করে। বাংলাদেশ যদি সত্যিই এগোতে চায়, তাহলে প্রথমেই পেন্টিয়াম ওয়ান মার্কা mindset বদলাতে হবে। প্রাসঙ্গিক পর্যটনবাঞ্ছা তৈরি করতে হবে, পর্যটনমনছবি গড়ে তুলতে হবে। পর্যটনকে প্রকল্প থেকে policy-তে নিতে হবে, policy থেকে execution-এ, execution থেকে experience-এ। এখানে তিনটি বিষয় জরুরি- প্রথমত, infrastructure must work, not impress। দ্বিতীয়ত, human capital must deliver, not just behave। তৃতীয়ত, branding must convert, not just communicate। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া কিংবা পর্যটননির্ভর হেডমাস্টার টাইপের দেশগুলো আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, তারা আমাদের আয়না, আবার গাইডও। দেখে, বুঝে, শিখে আয়োজন করে কপি করা যায়, কিন্তু পেস্টের জায়গায় নিজের মুনশিয়ানার প্রমাণ দিতে হবে।
বাংলাদেশ এখনও সুযোগের জায়গায় আছে, হারানোর জায়গায় নয়। কিন্তু সময় বেশি নেই। যে দেশ নিজের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে না, সে দেশ একসময় নিজেই অন্যদের উদাহরণ হয়ে যায়। আমরা কি উদাহরণ হব, নাকি উদাহরণ তৈরি করব?
আমি আশাবাদী মানুষ। পরিব্রাজকরা বাংলাদেশের সৌন্দর্য দেখবে, বুঝবে সংগ্রাম। বাংলাদেশ তখন শুধু মানচিত্রের দেশ থাকবে না, হয়ে উঠবে অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, অনুভূতি। কেউ ছবি নিয়ে ফিরবে, কেউ অনুভূতি নিয়ে। কেউ সমুদ্র মনে রাখবে, কেউ মানুষের মুখ। আর সেই গল্পগুলোর ভেতরেই বেঁচে থাকবে সংগ্রাম-সৌন্দর্যের ‘Beautiful Bangladesh’।
আমার প্রত্যাশা, আমার মতো করেই দূরদেশের কোনো এক পর্যটক কিংবা ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েটর বাংলাদেশে এসে বলবে, ‘জীবন দেখতে চাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, জীবন দেখাতে চাই।’
আসাদুজ্জামান রনি : লেখক ও ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েটর
মতামত লেখকের নিজস্ব
https://slotbet.online/