• মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম :

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা

অনলাইন ডেস্ক / ৫২ Time View
প্রকাশকাল : রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬

আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি পুরনো নিয়ম আছে। বড় শক্তিগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই নিজেদের স্বার্থকে সরাসরি স্বার্থ হিসেবে উপস্থাপন করে। তারা সেটিকে শান্তি, স্থিতিশীলতা, সহযোগিতা কিংবা উন্নয়নের ভাষায় সাজিয়ে তোলে। শুনতে ভালো লাগে, দেখতে আকর্ষণীয় লাগে, কিন্তু ভেতরে কী আছে, সেটি বোঝা যায় অনেক পরে। ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যায়, বহু চুক্তি ও উদ্যোগের ঘোষিত উদ্দেশ্য এক ছিল, আর বাস্তব ফলাফল হয়েছে আরেক।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস নিয়ে নতুন বক্তব্য শুনে সেই কথাটাই আবার মনে হলো। ইরান যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই তিনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে আবারও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের ছাতার নিচে আনার কথা বলেছেন। শুধু তাই নয়, ইরানকেও এই কাঠামোর অংশ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার যুক্তি, আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়লে উত্তেজনা কমবে, পুরনো বিরোধ পেছনে পড়ে যাবে, মধ্যপ্রাচ্য আরও স্থিতিশীল হবে।

শুনতে খারাপ লাগে না। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য এমন একটি অঞ্চল, যেখানে অনেক সময় সবচেয়ে আকর্ষণীয় ধারণাগুলোই বাস্তবতার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডস নিয়ে আলোচনা করতে হলে একটু পেছনে ফিরতে হবে। ২০২০ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, পরে মরক্কো ও সুদান ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সম্মত হয়েছিল। সেই চুক্তিগুলোর নাম দেওয়া হয় ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’। তখন এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মোড় বলে প্রচার করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, দীর্ঘদিনের বিভাজন পেরিয়ে নতুন সহযোগিতার যুগ শুরু হচ্ছে।

সমর্থকদের যুক্তি ছিল, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়লে রাজনৈতিক সমস্যাগুলোও ধীরে ধীরে সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু সমালোচকরা তখনই একটি প্রশ্ন তুলেছিলেন। ফিলিস্তিনের কী হবে? কারণ বাস্তবতা হলো, আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে কয়েকটি আরব রাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হলেও ফিলিস্তিন প্রশ্নের কোনো মৌলিক সমাধান সামনে আসেনি। স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি, জেরুজালেমের মর্যাদা, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ- সব প্রশ্ন আগের মতোই অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

অনেকটা এমন যেন বাড়ির দেয়াল নতুন রঙ করা হয়েছে, কিন্তু ভিত্তির ফাটলটি একই জায়গায় রয়ে গেছে। গাজা যুদ্ধ সেই বাস্তবতাকে আরও নগ্ন করে দিয়েছে।

আজকের মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বুঝতে হলে গাজার দিকে তাকানো ছাড়া উপায় নেই। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু, অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংস, উদ্বাস্তু মানুষের দীর্ঘ সারি- এসব শুধু সংবাদপত্রের খবর হয়ে থাকেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এসব দৃশ্য সরাসরি কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছেছে। আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষের মনোভাবও সেই সঙ্গে বদলেছে। অনেক সরকার হয়তো কৌশলগত কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি, কিন্তু জনমতের চাপ আগের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ফিলিস্তিন প্রশ্ন নতুন করে আবেগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

সৌদি আরবের অবস্থান তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ওয়াশিংটন বহুদিন ধরেই সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু রিয়াদ এখনও সতর্ক। কারণ সৌদি নেতৃত্ব জানে, ফিলিস্তিন প্রশ্নে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া এমন কোনো পদক্ষেপ দেশের ভেতরে এবং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বে বিতর্ক তৈরি করতে পারে। এখানেই ট্রাম্পের নতুন প্রস্তাব বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। তিনি এখন ইরানকেও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতায় আনার কথা বলছেন। কিন্তু ইরান ও ইসরায়েলের সম্পর্ক কোনো সাময়িক কূটনৈতিক মতবিরোধ নয়, যা কয়েকটি বৈঠক বা রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে মিটে যাবে। এটি চার দশকেরও বেশি সময়ের অবিশ্বাস, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আদর্শগত সংঘাতের ইতিহাস। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরান ইসরায়েলের প্রতি কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। অন্যদিকে ইসরায়েলও দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে তার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করে।

দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ খুব কম হয়েছে, কিন্তু প্রক্সি সংঘাতের তালিকা দীর্ঘ। লেবাননে হিজবুল্লাহ, সিরিয়ার সংঘাত, ইয়েমেনের বিভিন্ন গোষ্ঠী, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনা, সাইবার হামলা, গুপ্তহত্যার অভিযোগ- সব মিলিয়ে এই বিরোধ বহুস্তরীয়। এমন দুই পক্ষকে এক টেবিলে বসিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ধারণা রাজনৈতিক বক্তৃতায় আকর্ষণীয় শোনাতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তার পথ অত্যন্ত দীর্ঘ এবং অনিশ্চিত।

তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্য কোনো করপোরেট বোর্ডরুম নয়। এখানে ভূখণ্ডের প্রশ্ন আছে, ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্ন আছে, ঐতিহাসিক স্মৃতির প্রশ্ন আছে, এমনকি অপমান ও বঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাসও আছে। ফিলিস্তিন প্রশ্ন শুধু জমির প্রশ্ন নয়। এটি মানুষের পরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং রাষ্ট্র হওয়ার অধিকারের প্রশ্ন। জেরুজালেম শুধু একটি শহর নয়; ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম- তিন ধর্মের মানুষের কাছেই এটি গভীর আবেগের জায়গা। শরণার্থী সংকট শুধু পরিসংখ্যান নয়; এটি কয়েক প্রজন্ম ধরে বহন করা বাস্তুচ্যুতির ইতিহাস।

এসব বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে যদি বলা হয় অর্থনৈতিক সহযোগিতাই সব সমস্যার সমাধান এনে দেবে, তাহলে সেটি অতিরিক্ত সরলীকরণ হয়ে যায়। বাংলাদেশের জন্যও এই বিতর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। অনেকেই মনে করতে পারেন, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল কূটনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কী? সম্পর্ক আছে এবং তা গভীর। আমাদের লাখ লাখ শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। প্রতিবছর যে বিপুল রেমিট্যান্স দেশে আসে, তার বড় অংশই আসে এই অঞ্চল থেকে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাও অনেকাংশে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল।

হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা তৈরি হলে তেলের দাম বাড়ে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় আমরা সেই বাস্তবতা দেখেছি। তাই মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের স্বার্থেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। স্থিতিশীলতা আর চাপিয়ে দেওয়া সমঝোতা এক জিনিস নয়। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক সমাধান কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতি শান্ত করতে পারে, কিন্তু যদি মূল সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থাকে, তাহলে সংকট আবার ফিরে আসে।

মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও সেই ঝুঁকি রয়েছে। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, জেরুজালেম প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য সমাধান, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন এবং গাজার পুনর্বাসন- এসব প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে স্থায়ী শান্তির কথা বলা কঠিন। শান্তি কেবল কূটনৈতিক নথিতে লেখা কয়েকটি শব্দের নাম নয়। শান্তি তখনই টেকসই হয়, যখন সংশ্লিষ্ট জনগণও সেটিকে ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করে।

এ কারণেই আব্রাহাম অ্যাকর্ডসকে শুধু একটি শান্তি উদ্যোগ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি একই সঙ্গে একটি ভূরাজনৈতিক প্রকল্পও। যুক্তরাষ্ট্র এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে চায়, একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রভাবও সীমিত করতে চায়। এতে দোষের কিছু নেই। প্রতিটি বড় শক্তিই নিজের স্বার্থ দেখে। কিন্তু ছোট দেশগুলোর দায়িত্ব হলো সেই স্বার্থকে বুঝে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করা। বাংলাদেশেরও সেটিই করা উচিত। কোনো বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত পরিকল্পনার অন্ধ অনুসারী হওয়া নয়, আবার অকারণ বৈরিতাও নয়। জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং জনমতের ভারসাম্য রক্ষা করেই বৈদেশিক নীতি পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। ট্রাম্পের নতুন প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, সেটি ভবিষ্যৎ বলবে। তবে আপাতত উদ্বেগের দিক হলো, ইরানের পাশাপাশি পাকিস্তানকেও নাকি আব্রাহাম অ্যাকর্ডস মানার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশও নাকি এই তালিকায় আছে!

বিষয়টি আমাদের জন্য খুবই স্পর্শকাতর। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা যায় যে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটের সমাধান কোনো একক চুক্তি, কোনো রাজনৈতিক স্লোগান কিংবা কোনো নেতার ব্যক্তিগত উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভব নয়। কারণ সংকটের শিকড় অনেক গভীরে। আর যে সমস্যার শিকড় গভীরে, তার সমাধানও গভীর হতে হয়।

বাংলাদেশকে বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত বাস্তবমুখী শিক্ষা নিতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, আবার অন্ধ আনুগত্যও নয়- নিজস্ব জাতীয় স্বার্থই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা। কারণ বড় শক্তিগুলো যখন কোনো প্রস্তাবকে শান্তির পথ বলে উপস্থাপন করে, তখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো সেটি কার স্বার্থে এবং কতটা বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই প্রশ্নটি করা। সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো এখনই পাওয়া যাবে না। কিন্তু প্রশ্নটি না করাই হবে সবচেয়ে বড় ভুল।

চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক

মতামত লেখকের নিজস্ব


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
https://slotbet.online/