• শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০১:১১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
আলোচিত শিশু আছিয়া হত্যা : হাইকোর্টের রায় পিছিয়ে সোমবার রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে সৌদি বাদশাহ ও যুবরাজের অভিনন্দন হাইতিতে রাতভর সশস্ত্র গ্যাংয়ের হামলায় নিহত ৪৭ সোনার ভরি ছাড়াল ২ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআই ক্যামেরা, আইন ভাঙলেই ‘অটো ফাইন’ চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে সাড়ে ৫ কোটি টাকার সিগারেট জব্দ ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ, ২.৮০ কোটি টাকার ভুয়া বিলের দাবি বীরগঞ্জে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের উদ্বোধন, পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত চীনের উদ্ভাবন, সংস্কৃতি ও সবুজ উন্নয়ন দেখতে বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদল অসভ্যতার সব সীমা পার: আইইবিতে পরিবারসহ জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে লাঞ্ছনা ও প্রাণনাশের হুমকি, নেপথ্যে ‘হাবলুর গুরুর’ ক্যাডারতন্ত্র!

মাতৃত্ব শৃঙ্খল নয়, হোক আনন্দের

অনলাইন ডেস্ক / ১৯ Time View
প্রকাশকাল : রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬

একটি বিড়াল মা হয়েছে। ছানাদের প্রতি প্রগাঢ় মমতা নিয়ে সে পালন করে যাচ্ছে মায়ের দায়িত্ব। আবার কিছু সময়ের জন্য ছানাদের রেখে সে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। অথচ তার খাদ্যের ব্যবস্থা ঘরেই ছিল। তবুও একটি বিড়াল সন্তান পালনের মতো গুরুদায়িত্বের মধ্যেও ঠিকই ‘মি টাইম’ কাটিয়ে আসছে। নিজেকে গুছিয়ে রাখছে। প্রয়োজনমতো বিশ্রামও নিয়ে নিচ্ছে। মানবসমাজে (আসলে বলা ভালো পুরুষতান্ত্রিক সমাজে) মাতৃত্বকে যেভাবে একচেটিয়াভাবে ‘পবিত্র’ বা ‘অতিমানবিক’ করে তোলা হয়েছে, প্রাণিজগতে সে চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। প্রাণিজগতের মায়েদের আচরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা আমাদের শেখানো ‘মহত্ত্বের’ চেয়ে বরং ‘ব্যবহারিক’ দিকেই বেশি নজর দেয়। মানুষ মায়েদের যেখানে ২৪ ঘণ্টা সন্তানের চিন্তায় বুঁদ হয়ে থাকাকে ‘আদর্শ’ মনে করা হয়, প্রাণীরা সেখানে বেশ বাস্তববাদী।

মানবসমাজে মায়েদের ওপর এমন শ্রেষ্ঠত্ব আর মাহাত্ম্য চাপিয়ে দিয়েছে যে, ওই ভারেই মায়েরা পিষ্ট। হুমায়ুন আজাদের মতে, পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ শহীদের নাম ‘মা’। একজন মা যত বেশি নিজের সুখ, শখ-আহ্লাদ, স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে, সন্তান ও পরিবারের জন্য নিজ অস্তিত্বকে বিলীন করে দিতে পারবেন, তিনি তত ভালো মা। নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছা, শারীরিক ক্লান্তি কিংবা মানসিক অবসাদকে বিসর্জন দেওয়াই যেন মায়েদের প্রধান যোগ্যতা। যখনই একজন মা নিজের জন্য কিছুটা সময় চান বা নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবেন, সমাজ তাকে ‘স্বার্থপর’ তকমা দিতে দ্বিধা করে না। এই যে ত্যাগের মহিমা, তা মায়েদের রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে নয়, বরং এক রোবট বা দেবীতে পরিণত করে। কিন্তু প্রাণিজগতে মা হওয়া মানে স্রেফ একটি জৈবিক দায়িত্ব পালন করা। প্রাণীরা তাদের সন্তানদের বড় করে তোলে কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় নিজেদের অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন করে না। সন্তানের প্রতি তারা যত্নশীল কিন্তু তাই বলে পারফেক্ট মা হওয়ার কোনো প্রতিযোগিতায় প্রাণীদের নামতে হয় না। তারা ক্লান্ত হলে বিশ্রাম নেয়, ক্ষুধার্ত হলে আগে নিজে খায় এবং সন্তান বড় হলে তাকে মুক্তি দেয়।

‘মায়েরা শ্রেষ্ঠ’- এমন ধারণার বশবর্তী হয়ে, নারীর গর্ভধারণ করাকেই নারীত্বের একমাত্র মর্যাদা হিসেবে দেখা হয়। ফলে নারীদের সাধারণত বিয়ের ফুলসজ্জা হতে না হতেই বারবার সামাজিক দাবির মুখে পড়তে হয়, ‘বাচ্চা নিয়ে নাও।’ অথচ হয়তো সেই নারীর শরীর-মন মা হওয়ার জন্য তখনও যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয়নি। কিন্তু পরিবার ও সমাজের ইচ্ছাতেই বেশির ভাগ সময় তাকে গর্ভধারণ করে নিজেকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসাতে হয়। গর্ভধারণ করেই তারাও ঠিক একইভাবে অন্য নারীদের গর্ভধারণ করার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে দেন। হয়তো কোনো নারী নিজের কিংবা সঙ্গীর শারীরিক জটিলতা কিংবা কোনো কারণেই কখনও সন্তান ধারণ করবেন না অথবা কোনো নারী নিজ ইচ্ছাতেই অবিবাহিত থাকবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন- তাদের বারবার শুনিয়ে শুনিয়ে সেসব শ্রেষ্ঠ মা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার সুযোগ নেন এবং বলেন, ‘নিজে তো গর্ভধারণ করেনি, তাই মায়ের বেদনা বুঝবে না।’ অথচ যে নারী বছরের পর বছর চেষ্টা করে যাচ্ছেন একবার গর্ভধারণ করার কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছেন, তার বেদনা কি গর্ভধারণ করতে পারা শ্রেষ্ঠ মায়েরা বুঝতে পারেন?

আবার গর্ভধারণ করতে পারলেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সব মাকে একইরকম মর্যাদার চোখে দেখা হয় না। তাই কখনও কখনও নবজাতকদের পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় ডাস্টবিনে- কখনও জীবিত আবার কখনও মৃত। জন্মপ্রক্রিয়া যেমনই হোক, এজন্য শিশুটি তো দায়ী নয়! তবুও সমাজে এমন মাতৃত্ব ও নারীত্বের ওপর যুগ যুগ ধরেই কালিমা লেপন করে দেওয়া আছে। তাই শিশুটিকেই জগতের নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হয়। সেই সঙ্গে গর্ভধারণকারী মাকেও নীরবে সহ্য করে যেতে হয় শারীরিক-মানসিক যন্ত্রণা। গর্ভধারণ করতে পেরেও সমাজ স্বীকৃত ‘পবিত্র’ মা হতে না পারার গ্লানি বহন করে যেতে হয় জীবনভর। মানুষের বুদ্ধি ও আবেগ অবশ্যই মাতৃত্বকে এক অনন্য গভীরতা দেয়। কিন্তু আমরা যদি প্রাণীদের মতো বিষয়টাকে একটু ‘প্রাকৃতিকভাবে’ দেখতে শিখতাম, তবে মায়েদের ওপর থেকে এমন ‘পবিত্রতার বোঝা’টা একটু কমত। সমাজও আরেকটু মানবিক হয়ে উঠত বৈকি।

মায়েরা যদি সুপারমম হওয়ার ইঁদুর দৌড় থেকে বেরিয়ে এসে প্রাণীদের মতো কিছুটা বাস্তববাদী হতে পারেন, তবেই এই দমবন্ধ করা শ্রেষ্ঠত্বের ভার কমবে। মাকে সম্মান দেওয়া অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু সেই সম্মান যেন তাকে মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকার থেকে বঞ্চিত না করে। মাতৃত্ব কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নয়, এটি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মাত্র। একজন সুখী ও মানসিকভাবে সুস্থ মা তার সন্তানের জন্য একজন ‘নিঃস্বার্থ কিন্তু ক্লান্ত’ মায়ের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। আমাদের উচিত মায়েদের সেই ভারমুক্ত আকাশটুকু উপহার দেওয়া, যেখানে তিনি কেবল ‘মহৎ মা’ নন, একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবেও নিঃশ্বাসটুকু নিতে পারেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
https://slotbet.online/