মা—এটি শুধু একটি শব্দ বা মধুর ডাক নয়। এটি এমন এক মানুষ, যিনি সন্তানের জীবনকে নিজের জীবন দিয়ে আগলে রাখেন, ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে তাকে মানুষ করে তোলেন। মা এমন এক অমূল্য সম্পদ, যার বিকল্প দুনিয়া ও আখিরাতে আর কিছুই নেই। বন্ধু হারালে বন্ধু পাওয়া যায়, অর্থ নষ্ট হলে আবার উপার্জন করা যায়, সম্পদ হারালে পুনরায় গড়ে তোলা সম্ভব; কিন্তু মা একবার হারালে আর ফিরে পাওয়া যায় না।
মা বেঁচে থাকলে সন্তানের মাথার ওপর থাকে তার দোয়ার ছায়া। দুনিয়ার যত রং, যত আলো, যত জৌলুস আছে- তার মধ্যে মায়ের ভালোবাসার মতো শান্তি, মমতা ও নিরাপত্তা আর কোথাও নেই।
ইসলামে মায়ের সেবা অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার ভালো ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি হকদার কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ সাহাবি আবার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ আবার জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ চতুর্থবারে তিনি বললেন, ‘তোমার বাবা।’ (আল আদাবুল মুফরাদ: ৩)
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি মানুষকে তার মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করে এবং দুই বছরে দুধ ছাড়ানো হয়। সুতরাং আমার শুকরিয়া এবং তোমার মা-বাবার শুকরিয়া আদায় করো।’ (সুরা লুকমান: ১৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘তোমার মায়ের পায়ের নিচেই জান্নাত।’
আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি রাসুল (সা.) এর নিকট এসে বললো, আমি জিহাদে-সংগ্রামে অংশ নিতে চাই, কিন্তু আমার সেই সামর্থ্য ও সক্ষমতা নেই। তখন রাসুল (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার মাতা-পিতার কেউ কি জীবিত আছেন?’ লোকটি বলল, আমার মা জীবিত। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘তাহলে মায়ের সেবা করে আল্লাহর নিকট যুদ্ধ-সংগ্রামে যেতে না পারার অপারগতা পেশ কর। এভাবে যদি করতে পার এবং তোমার মা সন্তুষ্ট থাকেন তবে তুমি হজ, ওমরাহ এবং যুদ্ধ-সংগ্রামের সওয়াব পেয়ে যাবে। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং মায়ের সেবা করো।’ (মাজমাউজ জাওয়াইদ, হাদিস : ১৩৩৯৯)
বায়হাকির এক বর্ণনায় এসেছে, ‘যখন কোনো অনুগত সন্তান নিজের মা-বাবার দিকে অনুগ্রহের নজরে দেখে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে একটি করে কবুল হজের সওয়াব দান করেন।’ (সুনানে বায়হাকি: ৪২১)
বৃদ্ধা হয়ে গেলেও মায়ের সেবা জরুরি। একবার রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, ‘সে দুর্ভাগা! সে দুর্ভাগা! সে দুর্ভাগা!’ উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘সে কে?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি মাতাপিতা উভয়কে অথবা যেকোনো একজনকে বৃদ্ধাবস্থায় পেয়েও (তাদের সেবা করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারলো না।’ (মুসলিম: ৬২৭৯)
মায়ের সেবার পুরস্কার সম্পর্কে আরো একটি চমৎকার হাদিস আছে। হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিক (রা.)। নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমি যখন মিরাজে যাই, তখন সুললিত কণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াত শুনতে পাই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এমন মধুর তিলাওয়াত কার কণ্ঠ থেকে ভেসে আসছে?’ বলা হলো, ‘এটা হারিসা ইবনে নুমানের কণ্ঠ। সে ছিল পরম মা ভক্ত ছেলে।’ এতটুকু বলার পর নবীজি সাহাবিদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তোমরা হারিসার মতো মা ভক্ত হও। হারিসার মতো মা ভক্ত হও। অবশ্যই হারিসা অন্য সবার চেয়ে মায়ের প্রতি বেশি যত্নশীল।’
মাওলানা আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী এই হাদিস উদ্ধৃত করার পর আদাবুল মুফরাদের টিকায় লিখেন, ‘মায়ের সেবা এমন এক ইবাদত, যা বান্দার গুনাহ ঝরিয়ে জান্নাত নিশ্চিত করে দেয়।’ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে অনূদিত আদাবুল মুফরাদের টিকা, ২৮-পৃষ্ঠা)
https://slotbet.online/