• মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম :

দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি

অনলাইন ডেস্ক / ৯১ Time View
প্রকাশকাল : রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জননিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত মূল চালিকাশক্তি পুলিশের ওপর হামলা ও দলবদ্ধভাবে চাপ প্রয়োগের ঘটনা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, তার প্রমাণ মেলে খোদ নিজেদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয় ও সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত পুলিশ লাইনসের ভেতরও পুলিশ সদস্যদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায়।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও পুলিশ বিভাগ সূত্রে প্রাপ্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই (জানুয়ারি থেকে জুলাই) দেশজুড়ে পুলিশের ওপর হামলার মোট ৩৫৯টি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি বাহিনীর ওপর আঘাত নয়, বরং এটি সমগ্র রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভিতকে নাড়িয়ে দেয়ার মতো এক এলার্মিং চিত্র, যা দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরের শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার প্রবণতা ছিল বেশ ঊর্ধ্বমুখী। মাসভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, বছরের প্রথম তিন মাসের মধ্যে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে সমানসংখ্যক অর্থাৎ ৪২টি করে হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর মার্চের মাঝামাঝি সময়ে এই পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায় এবং পুলিশ আক্রান্তের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩টিতে।

পরিস্থিতির সবচেয়ে চরম অবনতি ঘটে এপ্রিল মাসে। ওই এক মাসে পুলিশের ওপর হামলার সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়ে ৬৬টিতে পৌঁছে, যা চলতি বছরের প্রথম সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। যদিও পরবর্তী মাসগুলোতে সামান্য ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। যেমন- মে মাসে ৫৫টি এবং জুনে কিছুটা কমে ৪৯টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়। তবে জুলাই মাসে এসে আবারও গ্রাফ ওপরের দিকে উঠতে শুরু করে এবং ওই মাসেও ৪২টি হামলার ঘটনা ঘটে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, সুযোগসন্ধানী ও অপরাধী চক্রগুলো বিভিন্ন সময়ে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে, যা কোনোভাবেই হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই।

গত বছরের জুলাই মাসের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই মূলত দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের ‘মব কালচার’ বা দলবদ্ধভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য এই সংস্কৃতি অত্যন্ত মারাত্মক। যখন কোনো সমাজে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা স্বাভাবিক বা নিয়মে পরিণত হয়, তখন ধীরে ধীরে অপরাধী আর নির্দোষ মানুষের পার্থক্য করার সুযোগটুকুও হারিয়ে যায়। এর ফলশ্রুতিতে সামান্য অভিযোগ, ভিত্তিহীন গুজব কিংবা তুচ্ছ কোনো ব্যক্তিগত বিরোধের জেরেও সাধারণ মানুষ যেকোনো মুহূর্তে সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হওয়ার তীব্র আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই মব সংস্কৃতির বিস্তার কেবল নিরপরাধ মানুষকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতেই ফেলছে না, বরং এর পাশাপাশি রাষ্ট্রের মৌলিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিচার ব্যবস্থার সামগ্রিক কর্তৃত্বকেও মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংস্কৃতি এখনই কঠোর হাতে দমন করা না গেলে তা সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এক গভীর অরাজকতার দিকে ঠেলে দেবে।

পুলিশের ওপর একের পর এক হামলার এই ঘটনাগুলো দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি সুস্পষ্ট অশনিসংকেত। সামপ্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জেরে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নানা ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। নানাবিধ মানসিক ও কাঠামোগত চাপের কারণে পুলিশ বাহিনী এখনো পুরোপুরি মনোবল নিয়ে পেশাগতভাবে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়নি। এমনিতেই নানামুখী সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে গিয়ে তাদের স্বাভাবিক আইন প্রয়োগ করতে নানা ধরনের বেগ পেতে হচ্ছে, তার ওপর এই ধরনের শারীরিক ও মানসিক হামলা পরিস্থিতিকে আরও বেশি উদ্বেগজনক করে তুলছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজে যদি সুরক্ষিত না থাকে এবং কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হতে থাকে, তবে সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে গভীর আস্থার সংকট তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। এ ধরনের ন্যক্কারজনক হামলা চিরতরে বন্ধ করতে হলে কেবল প্রশাসনিক কড়াকড়িই যথেষ্ট নয়, বরং জনপ্রতিনিধি ও সমাজের সচেতন নাগরিকদেরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশে দৃঢ়ভাবে ও প্রকাশ্যে দাঁড়াতে হবে। বারবার অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরও যদি অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা না যায়, তবে তা সমাজে এক ভুল বার্তা দেয় এবং অপরাধীদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তোলে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ গণমাধ্যমকে বলেন, যে কোনো সমাজে অপরাধীর দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করার মূল উদ্দেশ্য হলো অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীদের সহজে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না কিংবা বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিচ্ছে তারা। ফলে একই ধরনের অপরাধ সমাজে বারবার সংঘটিত হচ্ছে।

পুলিশের ওপর হামলা এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন যখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে, ঠিক তখনই ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনসের মতো সংরক্ষিত ও সুরক্ষিত এলাকায় পুলিশের ওপর হামলার একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং এর পেছনে কারা জড়িত তা গভীরভাবে যাচাই করে দেখা হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যারা জড়িত, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কঠোর ও অবধারিত আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
https://slotbet.online/