কিশোরগঞ্জের সন্দীপন সাহিত্য আড্ডার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কয়েকজন সাহিত্যকর্মীকে নিয়ে রেলগাড়িতে চড়ে কিশোরগঞ্জ যাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটি ফোন এলো। স্ক্রিনে যে ভদ্রলোকের ছবি ভেসে উঠল তিনি পুলিশের পোশাকে সজ্জিত। বনানী মডেল থানা থেকে কথা বলছেন বলে জানালেন। তিনি বললেন যে, আমার ফোনের সঙ্গে কোনো একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর ফোন কানেক্টেড হয়ে পড়ায় তদন্তকাজে বিঘ্ন ঘটছে। আমি যেন দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে এই কানেকশন বন্ধ করি; নইলে রাষ্ট্রীয় কাজে বিঘ্ন সৃষ্টির অপরাধে আমি অপরাধী হয়ে যাব। আমি কাজটি নিজে করতে না পারলে তিনি আমাকে সাহায্য করবেন। আমাকে শুধু একটি ওটিপি নম্বর জানাতে হবে।
আমাদের কথাবার্তা শুনে সাহিত্যিক দীপু মাহমুদ আমার হাত থেকে টেলিফোনটি নিয়ে নিলেন। পুলিশ ভদ্রলোকের (?) সঙ্গে তিনি অনেকটা ধমকের সুরে কথা বলতে শুরু করলেন এবং কলটি কেটে দিলেন। ভাগ্য ভালো, আমি ওটিপি দিয়ে তদন্তে সাহায্য করিনি। নইলে আমার ব্যাংক হিসাব শূন্য হয়ে যেত। আমার বন্ধুরা হয়তো ১০ বা ২০ হাজার টাকা পাঠানোর মেসেজ পেতেন। এর পরও আমি বিভিন্ন থানা থেকে এ ধরনের কল পেয়েছি। আমি তখন বলি, ভাই সাহেব, এই সিস্টেম তো পুরনো হয়ে গেছে। নতুন কিছু আবিষ্কার করেন। তখন টেলিফোন কেটে যায়।
বাংলাদেশে প্রতারণা এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধের নাম নয়। এটি ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হচ্ছে। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ প্রতারণার শিকার হচ্ছে। কেউ হারাচ্ছে সারাজীবনের সঞ্চয়, কেউ জমি বিক্রির টাকা, কেউ বা অবসরের তহবিল। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো- প্রতারণার ধরন বদলাচ্ছে, কিন্তু প্রতারকরা থেমে নেই। সমাজের সরলতা, মানুষের লোভ, ভয়, ধর্মবিশ্বাস, প্রযুক্তিগত অজ্ঞতা- সবকিছুকেই তারা পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করছে।
বাংলাদেশে বড় আকারের আর্থিক প্রতারণার ইতিহাস বেশ পুরনো। একসময় ‘যুবক’ নামক একটি গ্রুপের উত্থান হয়েছিল। তারা এমন এক স্বপ্ন দেখিয়েছিল, যেখানে অল্প বিনিয়োগে মানুষ দ্রুত ধনী হয়ে যাবে। গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শহরের শিক্ষিত চাকরিজীবী- অনেকেই সেই ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। অনেকে গরু বিক্রি করেছেন, কেউ জমি বন্ধক রেখেছেন, কেউ মেয়ের বিয়ের টাকা তুলে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, পুরো কাঠামোই দাঁড়িয়ে ছিল নতুন গ্রাহকের টাকা দিয়ে পুরনো গ্রাহককে পরিশোধ করার ওপর। অর্থাৎ এটি ছিল প্রতারণার এক সুপরিকল্পিত চক্র।
এরপর আসে ডেসটিনি। আধুনিক অফিস, স্যুট-টাই পরা কর্মকর্তারা, বিশাল সেমিনার, আকর্ষণীয় উপস্থাপনা- সব মিলিয়ে তারা নিজেদের একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের চেহারা দিয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ বিশ্বাস করেছিল যে তারা ভবিষ্যতের এক নতুন অর্থনৈতিক বিপ্লবের অংশ হতে যাচ্ছে। বাস্তবে যা হয়েছিল, তা হলো লাখো মানুষের অর্থ আটকে যায়। বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে। কেউ কেউ সামাজিক লজ্জায় বিষয়টি প্রকাশও করেনি।
ইউনিপে-টু-ইউ, এমএলএমভিত্তিক আরও কিছু প্রতিষ্ঠান এবং অনলাইন বিনিয়োগের নানা ফাঁদও একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছে। তারা মানুষের একটি সহজাত মানসিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছে- অল্প সময়ে বেশি লাভের আকাক্সক্ষা। অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম বলে, অস্বাভাবিক মুনাফার প্রতিশ্রুতির পেছনে ঝুঁকি থাকে। কিন্তু লোভে পড়ে অনেকেই এসব তত্ত্বকথা ভুলে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করে থাকে। এখন প্রতারণার নতুন যুগ শুরু হয়েছে- ডিজিটাল প্রতারণার যুগ। আগে প্রতারককে সামনে দেখা যেত, এখন তাকে দেখা যায় না। একটি ফোনকল, একটি মেসেজ, একটি লিংক- এগুলোই এখন প্রতারণার অস্ত্র। ‘আপনি লটারি জিতেছেন’, ‘বিদেশ থেকে উপহার এসেছে’, ‘এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে মাসে ২০ হাজার টাকা লাভ’- এমন প্রলোভনের ফাঁদে এখনও মানুষ পা দিচ্ছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, তথাকথিত ‘জিনের বাদশা’ বা অলৌকিক ক্ষমতার দাবিদার প্রতারকরাও সক্রিয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়- কাউকে বলা হচ্ছে, তার ঘরের নিচে গুপ্তধন আছে; কিন্তু সেটি তুলতে বিশেষ তাবিজ লাগবে। কেউ বলছে, জিনের সাহায্যে ভাগ্য পরিবর্তন করা সম্ভব। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এ কথা সত্য, এসব প্রতারণার শিকার শিক্ষিত মানুষরাই বেশি হয়ে থাকেন। পরে লোকলজ্জার ভয়ে তারা প্রতারণার কথা কাউকে বলেন না।
প্রতারকদের আরেকটি বড় শক্তি হলো সামাজিক মাধ্যম। এখন ফেসবুক পেজ খুলে ভুয়া ব্যবসা চালানো খুব সহজ। কেউ বিদেশি পণ্য আনার কথা বলে টাকা নেয়, কেউ অনলাইন চাকরির নামে নিবন্ধন ফি আদায় করে, কেউ আবার ক্রিপ্টোকারেন্সি বা অনলাইন ট্রেডিংয়ের নামে বিনিয়োগ সংগ্রহ করে। কিছুদিন পর দেখা যায় পেজ উধাও, ফোন নম্বর বন্ধ।
এ ধরনের প্রতারণা যে কেবল বাংলাদেশে হয় তা নয়। বিশে^র বহু দেশই ভয়াবহ আর্থিক প্রতারণার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। তবে সেসব ঘটনার বিচার ও পরিণতি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে।
২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক প্রতারণা। বার্নার্ড ম্যাডফ নামের এক বিনিয়োগ ব্যবসায়ী বহু বছর ধরে বিনিয়োগকারীদের উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই কেলেঙ্কারির পর ম্যাডফকে ১৫০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ভারতেও বড় ধরনের আর্থিক প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। ‘সারদা গ্রুপ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন অঞ্চলে লাখো মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি ধসে পড়ে। বহু মানুষ সর্বস্ব হারান। কেউ কেউ আত্মহত্যাও করেন। পরে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা তদন্ত শুরু করে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
নাইজেরিয়ার প্রতারণা বিশ^জুড়ে কুখ্যাত বলে পরিচিত। আগে পত্র লিখে এবং বর্তমান জামানায় ই-মেইল পাঠিয়ে বলা হয়- কোনো বিপুল অর্থ বিদেশে পাঠাতে সাহায্য করলে মোটা অঙ্কের কমিশন দেওয়া হবে। অনেকেই এই লোভে ব্যক্তিগত তথ্য ও অর্থ হারিয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক প্রতারণাও বিশ্বে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। এসব ঘটনা দেখায়, প্রতারণা কেবল দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশের সমস্যা নয়। প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও মানুষের মনস্তত্ত্ব- এই তিনটির দুর্বলতাকে ব্যবহার করে প্রতারকরা সর্বত্র সক্রিয়। তবে উন্নত দেশগুলোতে একটি বিষয় স্পষ্ট- বড় প্রতারণার পর কঠোর তদন্ত, দ্রুত বিচার ও আর্থিক খাতের সংস্কারের চেষ্টা দেখা যায়। বাংলাদেশের জন্যও সেটিই বড় শিক্ষা হতে পারে।
একটি সুস্থ অর্থনীতি মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখে এই বিশ্বাসে যে তা নিরাপদ। মানুষ অনলাইনে লেনদেন করে এই বিশ্বাসে যে প্রতারিত হবে না। মানুষ বিনিয়োগ করে এই বিশ্বাসে যে আইন তাকে সুরক্ষা দেবে। কিন্তু যখন প্রতারণা ব্যাপক হয়ে যায়, তখন সেই আস্থার ভিত নড়ে যায়। এটি মানুষের সঞ্চয় ধ্বংস করে, সামাজিক আস্থা নষ্ট করে এবং অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আবার এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও ভয়াবহ হতে পারে। মানুষ ডিজিটাল লেনদেন এড়িয়ে চলতে শুরু করবে। অনেকে সঞ্চয় ব্যাংকে না রেখে ঘরে রাখবে। নতুন প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবার ওপর সন্দেহ তৈরি হবে। এতে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এ অবস্থায় শুধু পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ব্যাপক আর্থিক ও ডিজিটাল শিক্ষার বিস্তার। স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে- ওটিপি কাউকে দেওয়া যাবে না, অস্বাভাবিক মুনাফার প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করা যাবে না, অপরিচিত লিংকে ক্লিক করা বিপজ্জনক। একই সঙ্গে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে সব মানুষের কাছে প্রতারণা রোধের এসব সতর্কতা জানাতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো দ্রুত বিচার। বাংলাদেশে অনেক বড় বড় প্রতারণার মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এতে প্রতারকরা সাহস পায় এবং সাধারণ মানুষ হতাশ হয়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এই প্রবণতা কমবে না। যুবক, ইউনিপে টু ইউ, ডেসটিনিসহ প্রতারক প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোক্তাদের কোনো বিচার হয়েছে বলে জানা যায়নি। ডিজিটাল প্রতারণার মাধ্যমে দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় দলবদ্ধ চক্র গড়ে উঠেছে, যারা টেলিফোন কলের মাধ্যমে প্রতারণা করে থাকে। এদের কেউ ধরা পড়ে না, তাদের বিচারও হয় না। ইউটিউবে ‘জিনের বাদশা’ লিখে তল্লাশি দিলে প্রতারক জিনদের অস্তিত্ব টের পাওয়া যাবে। এরা মানুষের লোভ ও ধর্মভীতি কাজে লাগিয়ে ছলচাতুরী করে টাকা হাতিয়ে নেয়।
বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল অর্থনীতি, স্মার্ট বাংলাদেশ ও প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের কথা বলছে। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে না, যদি প্রতারণা একটি লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়। উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক আস্থা রক্ষা করাও রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব। কারণ প্রতারণা শুধু মানুষের টাকা চুরি করে না; এটি সমাজের বিশ্বাসও চুরি করে নেয়।
মাহফুজুর রহমান : সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক
মতামত লেখকের নিজস্ব
https://slotbet.online/